বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ রাজনৈতিক অস্থিরতায় এবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চা ব্যবসায়ীরা। দিন দিন এখাত নাজুক হয়ে পড়ছে। কোনো অবস্থাতেই ব্যবসায়ীরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীর এখন মাথায় হাত উঠেছে। সবাই চা ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, বাংলাদেশের চা শিল্প দিন দিনই হুমকির মুখে পড়ছে। এক সময় যে দেশ চা রপ্তানিতে সমৃদ্ধ ছিল কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই দেশ চা আমদানির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের পঞ্চম চা রপ্তানিকারক দেশের রপ্তানি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শুন্যের কোটায় নেমে আসবে চা রপ্তানি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ৪৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৬৯ কেজি চা পাতা আমদানি হয়েছে। অথচ গত অর্থবছর দেশে চা উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন কেজি। টি ব্রোকার্স ও ব্লেন্ডাররা গত বছর চীন থেকে প্রতি কেজি ৭৩.৭০, থাইল্যান্ড থেকে ৭০, ভারত থেকে ১১৮.৭৫, ব্রাজিল থেকে ১২০.৩৯, আরব আমিরাত থেকে ৭১.৮৭, কেনিয়া থেকে যথাক্রমে ৮৩.৭০, ১০৫ ও ১২০ টাকা দরে চা আমদানি করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চা সংসদ সূত্রে জানা যায়, জিনিসপত্র, সার ও কীটনাশকের মূল্য বেড়ে যাওয়া, চা শ্রমিকের রেশন হাজিরা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে দেশের বাগানগুলোয় প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ পড়ে ১৭০-১৮০ টাকা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চা রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা ৮ কোটি টাকা (১ ডলার ৮০ টাকা ধরে)। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে চা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকার। চলতি অর্থবছরে চা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে চলমান অবস্থায় চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চা রপ্তানি কমার কারণ হিসেবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বেশি করে দায়ী করা হচ্ছে। তাছাড়া দেশে চায়ের উৎপাদন কমে যাওয়া, দেশিও বাজারে চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, চা বাগানগুলোর বয়স বৃদ্ধি পাওয়া, চায়ের জন্য জমি ইজারা নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা, পুরোনো জাতের বীজের ব্যবহার অব্যহত থাকা, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না লাগা, চা বাগানে কর্মরতদের জীবন মানের উন্নতি না হওয়া, দলীয়করণসহ প্রভৃতি কারণে দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে চা উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে সরকারিভাবে চা শিল্পের জন্য কোনো অর্থ সহায়তা না থাকাটা বড় কারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এডিপিতে এ খাতের উপরে কোনো অর্থ বরাদ্দও থাকছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েক ধরে চা চাষের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমে গেছে। চা চাষের জন্য বরাদ্দ নেওয়া বহু জমি অনাবাদি থেকে থাকছে প্রতিবছর। তাছাড়া প্রতিবছর চায়ের জন্য সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ভূমি বৃদ্ধির কথা থাকলেও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার কারণে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। কারণ দেশে চা চাহিদা বাড়ছে, তবে চাষের পরিধি বাড়ছে না। তবে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এখনো যুক্তরাজ্য, জাপান কুয়েত, কাতার, পাকিস্তানসহ মধ্য প্রাচ্যের কিছু দেশে বাংলাদেশি চায়ের চাহিদা থাকায় রপ্তানি হচ্ছে। এখনো জাপান, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশে চা রপ্তানি হচ্ছে।
জানা যায়, দেশে এখন ১৬৩টি চা বাগান রয়েছে। যার অধিকাংশ এখনও মৌলভীবাজার জেলাতে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলাতে ৯০টি, সিলেটে ১৯টি, চট্টগ্রামে ২২টি, হবিগঞ্জে ২৩টি চা বাগান রয়েছে। এছাড়া চা শিল্পের সম্ভাবনাময় জেলা পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙামাটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি করে চা-বাগান রয়েছে। এসব বাগানে উৎপাদন হওয়া চা রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে এখনও টিকে আছে চা শিল্প। তবে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চা শিল্প আবার তার হারানো অবস্থানে ফিরে আসতে পারতো। এমনটাই ভাবছেন চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত শ্রীমঙ্গলস্থ প্রকল্প উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ সরকার জানান, আসলে আমদানির জন্য নয়, বর্তমানে চায়ের উৎপাদন বেড়ে চলছে, প্রায় সব বাগানে প্রচুর চা উৎপাদন হচ্ছে। শুধুই তাই নয়, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খুচরা বাজারে চায়ের চাহিদা কমে গেছে। এর ফলে নিলামে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চা কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারে এর দাম কমেছে।